সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে সিএসইতে পড়তে ইচ্ছুক ছাত্রদের সংখ্যা
তুলনামূলকভাবে বেড়ে গেছে। এর প্রধান কারণ সম্ভবত বৈশ্বিক চাকরির বাজারে
সিএসইর ছাত্রদের ভাল দাপট থাকাটা। আমাদের দেশে মোটামুটি সব পাবলিক ও
প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েই সিএসই সাবজেক্টটা পড়ানো হয়। এর ফলে সিএসইতে পড়তে
পারা ছাত্রের সংখ্যা যেমন বেড়ে গেছে ঠিক তেমনি বাড়ছে উদ্বেগ। প্রাথমিক
উদ্বেগটা হল ভার্সিটি বাছাই নিয়ে। সবারই এক প্রশ্ন, কোথায় পড়ব সিএসই? আর
পরের উদ্বেগটা হল মান নিয়ে। আজ এগুলো নিয়েই কিছু কথা বলব ইনশাআল্লাহ।
কিন্তু এর আগে একটা ডিসক্লেইমার দেয়া ভাল। আমার এই লেখাটা একান্তই আমার
ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণের ফলাফল, সিএসইতে ভর্তিচ্ছুক আমার জুনিয়র
ভাই-ব্রাদারদের জন্য। আমি যেমন একটা পাবলিক ভার্সিটিতে সিএসইতে পড়ছি ঠিক
তেমনি জব মার্কেটেও আমার অল্প-বিস্তর পদচারণা রয়েছে। আর সেই লব্ধ অভিজ্ঞতা
থেকেই আমি আমার লেখার মাল-মশলা যোগাড় করেছি।
ভাল ভার্সিটি বনাম ছাত্রের পরিশ্রমঃ
প্রথমেই আমরা দেখব সিএসইতে পড়ার জন্য কোনটা আসলে বেশি দরকার – ভাল
ভার্সিটি নাকি ভাল ছাত্র। যদি সিএসইকে আত্মীকরণ না করে উত্তরটা দিতে হয় তবে
পাল্টা একটা প্রশ্ন ছুড়ে দেয়া যায়। প্রশ্নটা হল – ভার্সিটি আসলে একজন
মানুষকে কি শেখায়? উত্তরটা হল – চিন্তা করতে। হ্যাঁ, তুমি ঠিকই পড়েছ।
ভার্সিটি কোন মানুষকে কাজ করতে শেখায় না, শেখায় শুধু চিন্তা করতে। আসলে এই
চিন্তা করাটাই আসল। নতুন নতুন আইডিয়া না আসলে সেটা ইমপ্লেমেনটেশনের জন্য
কাজ করার প্রশ্নই ওঠে না। তবে একজন ছাত্রের কাছে ভার্সিটি হল পড়া মুখস্থ
করার জায়গা না, তার ক্যারিয়ার গঠনের জায়গা। ভার্সিটিতে বসে একজন ছাত্র যদি
পড়া মুখস্থের দিকে বেশি গুরুত্ব দেয় তবে তার কপালে যে ভয়াবহ দুর্গতি আছে তা
আর বলতে। কারণ বিপদের দিনে মুখস্থ বিদ্যা সঙ্গ দেয় না! এজন্যই প্রফেসরদের
একটা কথা কান ঝালাপালা করে দিতে পারে – বুঝে পড়। তাই তোমাকে নিজ দায়িত্বে
বুঝে বুঝে পড়তে হবে, কাজ করতে হবে। যাহোক, আর তর্কে না গিয়ে জেনে নেব আরো
কিছু।
সিজিপিএ না দক্ষতা?
তুমি যদি বিডিজবস বা প্রথম-আলো-জবসের মত বড়বড় কয়েকটা জব মার্কেট ঘাটো
তবে তুমি দেখবে ৯৫% এরও বেশি কোম্পানি কোন স্ট্রং এডুকেশন ব্যাকগ্রাউন্ড
চায় না সিজিপিএ তো দূরের কথা। তারা চায় দক্ষ লোক। একটা হিসাব করা যাক, মনে
কর কোন কোম্পানি বুয়েটের এই বছরের ফার্স্ট বয়কে চাকরিতে এপয়েন্ট করল কিন্তু
কাজ করার সময় দেখা গেল সে কাজের বেলায় অষ্টরম্ভা। তোমার কি মনে হয়? ঐ
কোম্পানি তাকে কাজে রাখবে? কক্ষণোই না, মনে রাখবে কোন কোম্পানি কখনোই লস
দিতে চায় না, লস দেয় না, দিতে পারে না।
সিজিপিএ একটা বিষয় বটেঃ
যতকিছুই আমরা বলি না কেন সিজিপিএ একটা ব্যাপার বটে। কিছু কিছু কোম্পানি
কখনো কখনো সিজিপিএ উল্লেখ করে দেয় যাদের সংখ্যা ৫% এরও কম। এরা সাধারণত
সিজিপিএ ৩.০০ এর উপরে চায়। তাই সিজিপিএ ৩ এর উপরে রাখতে পারাটা আমার মনে হয়
সেইফ সাইডে থাকার মত। (আমি নিজেও পারছি না। আফসোস!)
ভার্সিটি একটা বিষয় বটেঃ
একইভাবে ভার্সিটিও একটা বিষয় বটে। ১% এরও কম এমন কিছু কোম্পানি রিনাউন্ড
ভার্সিটি বলতে বোঝে বুয়েট, কুয়েট, চুয়েট, রুয়েট আর সাস্ট। এরা হয়ত সংখ্যায়
কম তবে আছে কিন্তু। তুমি ৩০ দিন চাকরির বিজ্ঞাপন দিলে ১ দিন হয়ত এদের খোঁজ
পেতে পার। তাই আমি বলব সেইফ সাইডে থাকার জন্য তুমি এদের দিকে টার্গেট করে
প্রস্তুতি নিতে পার। (আফসোস! আমি নিজেও বিপদে আছি।)
সব কথার শেষ কথা দক্ষতাঃ
আমার উপরে বর্তমানে একটা আইটি ফার্মের লোক নিয়োগের দায়িত্ব চেপে আছে।
দায়িত্বটা আমি ইচ্ছা করে নিইনি আবার অন্য কেউও চাপায়নি। বরং দায়িত্বটা নিজ
থেকে এসে আমার ঘাড়ে চেপে বসেছে। টর্চ মেরে লোক খুঁজতেছি কিন্তু পাচ্ছি না।
পাচ্ছি না বলা ঠিক না, কথা হল তাদের নিচ্ছি না। সেদিন কুয়েটের এক ছেলে সিভি
ড্রপ করল। কথা-বার্তা বললাম। রেজাল্ট ভাল। ভাল মানে ৩.৫ এর উপরে। কিন্তু
কাজ-কর্ম কিছুই পারে না। এপ্লাই করেছিল সিস্টেম এডমিনিস্ট্রেশানের জন্য,
ইন্টারভিউ নিয়ে বুঝলাম আমার সময়টাই মাঠে মারা গেল। তো ব্যাপার এটাই, যদি
তোমার অভিজ্ঞতা না থাকে তবে যেমন ঠেকতে হবে তার চেয়েও বেশি ধাক্কা খেতে হবে
দক্ষতা না থাকলে।
আইসিপিসি ভার্সিটির কোন মানদন্ড নাঃ
বেশিরভাগ পোলাপানের একটা ঘোড়ারোগ আছে। এরা এসিএম-আইসিপিসি দিয়ে ভার্সিটি
হিসেব করে। আরে ভাই আইসিপিসি ভার্সিটির কোন কিছু না, এটা একটা ঐচ্ছিক
ব্যাপার। আর সবচেয়ে বড়কথা আইসিপিসিতে ভাল তারাই করে যারা এক প্রকার কোডিং
জিনিয়াস। আর ঐরকম কোডিং জিনিয়াস সবখানেই থাকে। এখন তুমি যদি মনে কর তুমি
জিনিয়াস তাইলে তুমি যেখানেই থাক না কেন তুমি জেগে উঠবেই। আর যদি না হও, তবে
ভাই বাছ-বিচার করে কি লাভ?
পাবলিক বনাম প্রাইভেটঃ
ইদানীং পোলাপান সবচেয়ে বেশি যুদ্ধ করে পাবলিক-প্রাইভেট ইস্যুতে। আমি
বুঝি না মানুষে ফাও প্যাঁচালের এত সময় পায় কোথায়। তুমি পাবলিকে পড়বে নাকি
প্রাইভেটে পড়বে এটা নির্ভর করে তোমার অর্থনৈতিক বিষয় ও পড়াশুনার উপর।
পাবলিক ভার্সিটিতে চান্স পাবার বিষয় থাকে। বুয়েট, সাস্ট, কুয়েট, রুয়েট,
ঢাবি, জাবিতে ট্রাই করতে পার। প্রাইভেটের ভিতর AIUB, NSU, BRAC, EWU, UIU
ভাল বলে শুনেছি। তবে হা, আমার কাছে সবগুলাই সমান মনে হয়। কারণ কোন ভার্সিটি
খারাপ শিক্ষা দেয় না। কিন্তু ভুঁইফোড় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাবধান।
বড়ভাইতন্ত্রঃ
তোমরা গণতন্ত্রের নাম শুনেছ, সমাজতন্ত্রের নাম শুনেছ। কিন্তু এসবের
বাইরেও ভার্সিটিতে এক প্রকার তন্ত্র চলে যার নাম বড়ভাইতন্ত্র। এর যেমন
ভালদিক আছে তেমনি খারাপ দিকও আছে। ভাল দিকটা দেখতে পার সাস্টে। সাস্ট গত
কয়েক বছরে পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এর কারণ ওদের বড়ভাইতন্ত্র। ওদের ওখানে
সিনিয়ররা নানা ক্লাব, কর্মসূচী, প্রতিযোগীতা ইত্যাদি দিয়ে ওদের সব সময়
ব্যস্ত রাখে। ওরা সব সময় প্রোগ্রামিং করার ভিতরে থাকে বলেই ওরা এই সেক্টরে
ধাপে ধাপে উন্নতির দিকে যাচ্ছে।
সবচেয়ে বড়কথাঃ
সবচেয়ে বড়কথা হল মানুষের কথা না শুনে নিজের বিচার-বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে
কোথাও ভর্তি হয়ে যাও। পরিশ্রম কর, আশা করি ফল পাবে। আমি মোটামুটি কিছু
জিনিস আলোচনার চেষ্টা করে। তারপরও কোন প্রশ্ন থাকলে আমার সাইটের
কমেন্টবক্সে কর। আর হ্যাঁ, আমাদের “পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
বিশ্ববিদ্যালয়ে” তোমাদের সবাইকে আসবার আমন্ত্রণ।
#_Courtesy : মাকসুদুল রহমান মাতিন , পবিপ্রবি ।।